সংবাদ সম্মেলনে বিটিএমএ

জ্বালানি সংকটে কারখানাগুলো উৎপাদন সক্ষমতার ৪০-৫০% ব্যবহার করতে পারছে

দেশের অর্থনীতিতে টেক্সটাইল খাতের বড় অবদান রয়েছে। তবে জ্বালানি সংকটের কারণে গত ৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম চালাতে পারছে না এ খাতের কারখানাগুলো।

দেশের অর্থনীতিতে টেক্সটাইল খাতের বড় অবদান রয়েছে। তবে জ্বালানি সংকটের কারণে গত ৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম চালাতে পারছে না এ খাতের কারখানাগুলো। নানা সংকটে ৫০ শতাংশ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সবশেষ কয়েক মাসের তীব্র গ্যাস সংকটে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৪০-৫০ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে। এতে একদিকে সুতা, কাপড় ও পোশাকের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে, অন্যদিকে বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়। যার প্রভাব পড়ছে রফতানি আয়ে।

রাজধানীর গুলশান ক্লাবে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। শিল্প খাতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিরসনের দাবিতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

এ সময় ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই), বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ), বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই), ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশ, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলএফএমইএবি), বাংলাদেশ টেরি টাওয়েল অ্যান্ড লিনেন ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিটিএলএমইএ) এবং বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। তিনি বলেন, ‘টেক্সটাইল খাত দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যার সম্মুখীন। এর মধ্যে গ্যাস-বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট, ব্যাংক সুদের হার ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি, রফতানি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত ৩৭ শতাংশ শুল্কারোপ, রফতানির বিপরীতে নগদ প্রণোদনা হ্রাস এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের সংকট অন্যতম।’

তিনি বলেন, ‘টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের কারখানাগুলোয় হঠাৎ করেই মারাত্মক গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। দুই সপ্তাহ ধরে চলা পরিস্থিতিতে সমস্যা ধীরে ধীরে প্রকট হচ্ছে। কয়েক মাস ধরে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৪০-৫০ শতাংশের বেশি ব্যবহার করতে পারছে না। যেটি এ খাতের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে ক্ষুণ্ন করছে। এর প্রভাব রফতানি আয়ে পড়ছে।’ মিল-কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করতে না পারলে ঈদুল আজহার সময় শ্রমিকদের বেতন-বোনাস কীভাবে দেয়া হবে সেই প্রশ্নও তোলেন বিটিএমএ সভাপতি।

এ সময় বিটিএমএর পক্ষ থেকে অবিলম্বে শিল্প খাতে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, শিল্প খাত ও ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টগুলোয় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত স্থগিত, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই মূল্য নির্ধারণ নীতিমালা প্ৰণয়ন এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে মধ্য-দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, ‘ব্যাংকের সুদ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে দফায় দফায়। আমরা টাকা খরচ করেও প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছি না। সরকারের সুযোগ-সুবিধার কথা শুনে বিনিয়োগ করছি, অথচ সহযোগিতা পাচ্ছি না। তাহলে শিল্প-কারখানা চলবে কীভাবে? বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে আমরা ৬০ শতাংশও উৎপাদন করতে পারছি না। ব্যাংকে সুদের সঙ্গে বাড়ছে ব্যয়, বিপরীতে উৎপাদন কমছে।’

ঈদুল আজহায় ১০ দিনের ছুটির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘যে দেশে অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায়, সেই দেশে সরকারিভাবে ১০ দিনের ছুটি ঘোষণা কীভাবে আসে আমি বুঝি না। একদিন সবকিছু বন্ধ থাকা দেশের জন্য বড় ক্ষতি, সেখানে কোন যুক্তিতে এত লম্বা ছুটি দেয়া?’

গ্যাসের সিস্টেম লস প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের সাধারণ সদস্য জাকির হোসেন নয়ন বলেন, ‘আমরা গ্যাস পাচ্ছি না, অথচ গ্যাস চুরি হয়ে যাচ্ছে। দেশে ১২-১৪ শতাংশ গ্যাসের সিস্টেম লস হয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সিস্টেম লসের আদর্শ মান ২ শতাংশ। আমাদের দেশের ১ শতাংশ সিস্টেম লসকে টাকার অনুপাতে হিসাব করলে দাঁড়ায় ৮ হাজার কোটি টাকা।’ সিস্টেম লসের নামের গ্যাস লোপাট বন্ধ ও কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতের দাবি জানান তিনি।

বিটিএমএ সহসভাপতি সালেহউদ জামান খান বলেন, ‘আমার কারখানার শ্রমিকদের প্রতিদিন ৬০ লাখ টাকা বেতন দিতে হয়, যা মাসে ১৫ কোটির বেশি। কিন্তু গ্যাসের সংকটে কারখানা চলছে না, শ্রমিকরা এসে বসে থেকে চলে যাচ্ছে। উৎপাদন না হলে শ্রমিকদের বেতন কীভাবে দেব?

সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য দেন বিটিএমএর পরিচালক রাজিব হায়দার, খোরশেদ আলম ও আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং বিটিটিএলএমইএর চেয়ারম্যান হোসেন মেহমুদ, সাবেক চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন প্রমুখ।

আরও